চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সলুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিন



বণ্যাঢ্য সংক্ষিপ্ত জীবনের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স প্রায় ৬৮ বছর। গত কয়েক বছর শারীরিক ও মানুষিকভাবে চিন্তিত থাকার কারণে, জটিল-দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুর পথযাত্রী হতে হলো সৎ-সাহসী, মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দীন। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি চির বিদায় নেন। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস, বাঙালীর ইতিহাসে  সারা বাংলাদেশে ৪৫ তম বিজয় দিবস উদযাপিত করে। কত বন্ধু-মহল, সহযোগী মুক্তিযোদ্ধারা, রাজনৈতিক সহকর্মীরা একসাথে বিজয় দিবস পালন করবে। দেশকে স্বাধীন করল যে মুক্তিযোদ্ধা, যাদের অবদানের ফলে আজ দেশের লাল সুবজের পতাকা উন্মেচিত হলো- ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে দিয়ে যারা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে তুলল-একসাথে সমবেত হয়ে মুক্তিযোদ্ধার ৪৫তম বিজয় দিবস পালন করবে। কে জানত; মুক্তিযোদ্ধার ৪৫ বছর পর তাঁকে বিদায় জানাতে হবে -এ পৃথিবীকে, কে জানত; বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দীনকে হটাৎ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তর মধ্যে দিয়ে বিদায় জানাতে হবে বন্ধু বান্ধব, কলা-কুশলী, রাজনৈতিক সহকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা সহকর্মীকে। কে জানত; মৃত্যুর কাছে এত সহজে ধরা দিতে হবে।


কর্মময় জীবনঃ
স্বাধীনতার পর কর্মময় জীবনে একাধারে চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারের সরকারী ক্লিনিকে “মেডিকেল সার্ভিসেস” হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পেশায় সুদক্ষতার কারণে এলাকার মানুষের সেবা করা সুযোগ পান । এলাকার জনপদের চিকিৎসা সেবা, সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে কর্মময় জীবনে পদোন্নতি গ্রহনের সুযোগ আসলেও তা গ্রহন করেননি, সমাজে এমন মানুষের সন্ধান করলে খোঁজ মেলানো কষ্টসাধ্য। তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা মো: নাজিম উদ্দীন। সৎ, যোগ্য, নির্ভীক সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধা এলাকার জনপদের মানুষের কথা চিন্তা করতে গিয়ে নিজের কর্মময় জীবনে পদোন্নতি গ্রহণের সুযোগ আসলেও তিনি সলুয়া অঞ্চলের অসহায় দুস্থ গরীব মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হবে বলে সুযোগ গ্রহণ করতে চাননি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দীন স্ত্রী সন্তানদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কথা চিন্তা করে পৈতৃক বাসস্থল ফেলে রেখে যশোর জেলার পালবাড়ী মোড়স্থ’ বাস করতেন। দুই কন্যা, এক ছেলে সন্তান সবাইকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। বড় কন্যা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে মেয়ে সন্তান জামাই নিয়ে রাজধানী ঢাকা থাকেন। ছোট কন্যা ও তার জামাই যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। এক ছেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করিয়েছেন- বাবার পৈতৃক সম্পত্তি দেখাশোনা করা পাশাপাশি নিজ উদ্দ্যেগে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের জড়িত আছেন।

রাজনৈতিক জীবনঃ
প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দীন মৃত্যুকাল পর্যন্ত রাজনৈতিক জীবনে ভাসানী পার্টি সংগঠনের আদর্শ বুকে ধারণ সমর্থন করে গেছে, বস্তুতঃ স্বাধীনতার পর ভাষানী ন্যাপ পার্টি করার ক্ষেত্রে বৃহত্তর যশোর জেলার কয়েকজন ব্যক্তি সৎ-সাহস নিয়ে এগিয়ে আসে তাঁর মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দীন একজন। সৎ, নীতিবান, ধার্মিক, পরিশ্রমী, সুষম কাঠামোর অধিকারী গুণী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজনৈতিক জীবনে একাধারে শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতিত, অসহায় মানুষের প্রতি পাশে থাকার জন্য ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি ন্যাপ (ভাষানী) সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। বৃহত্তর যশোর জেলার সাধারন সম্পাদকের পদ দায়িত্ব ছিলেন। গত দশম নির্বাচনে ৮৬"যশোর-২ আসন থেকে ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি ন্যাপ (ভাষানী) মনোনয়নের প্রত্যাশী ছিলেন। প্রয়াত বীরমুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে ন্যাপ যশোর জেলার শাখার পক্ষ থেকে শোক বার্তা প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা চলাকালে কত মুক্তিযোদ্ধা তাঁর সামনে শহীদ হয়েছেন। এরপর যখন প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর আসত যে সকল মুক্তিযোদ্ধারা চলে গেছেন তাদের রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করতঃ কিন্তু; ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এমন দিনে তাকে চলে যেতে হলো মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দীনকে। যে দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশকে স্বাধীন করল যেদিনে বিজয় পতাকা বুকে ধারণ করে বিজয় উল্লাস করল, সেই দিনটি  চলে যেতে হলো- মায়াময় পৃথিবীর সবকিছু ফেলে রেখে, জীবনবাসন ঘটল বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দীনের ।
শরীরের মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে হার্ডে ব্লক ধরা পড়ে, তারপর যশোর সদর হাসপাতালের করোনারী বিভাগের কর্মরত চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক খুলনায় চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়, হার্ডে রিং বসানো হয়, পরবর্তী কিছুটা সুস্থ অনুভব হলে তাকে যশোরের আনা হয়, কিন্তু যশোর আসার পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে খুলনায় নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু; কে জানত ; এবার হয়ত আর জীবন্ত হয়ে ফিরে আসবে না। প্রয়াত এই বীর-মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ২ কন্যা, ১ ছেলে, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-মহল, শুভাকাঙ্খী, রাজনৈতিক অঙ্গণে সহকর্মী, গুণগ্রাহী রেখে গেছেন,

বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দীন আমাদের মাঝে নাই, তিনি রেখে গেছেন তার আদর্শভরা কিছু দুর্লভ মুহুর্ত গুলো, গুনী এই মানুষটি সু-স্বাস্থরের প্রতি অসম্ভব মনোযোগী। কিন্তু ; বাধ্যক্য জনিত নয়, কখন-কখন শারীরিক ও মানুষিক চিন্তার বাধ্যক্যের কাছে হার মানতে হয়। মেধা-মননে, কর্মে অত্যন্ত সুদক্ষ এই বীর-মুক্তিযোদ্ধা, তাঁর বাবা আব্দুস সোবহান (মাষ্টার) একজন পেশায় শিক্ষকতায় সুখ্যাতি ছিলেন। শৈশবে বাবার আদর্শ ধারণ করে পেশায় চিকিৎসা সেবাকে প্রাধান্য দিয়ে মানুষের সেবা করে গেছেন। ১৯৪৮ সালে যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার সলুয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। শৈশবে নিয়মনুবর্তিতা ও শৃংখলাবোধের প্রতি কঠোর ছিলেন। আচার আচারণ রুচিশীল, নম্র ও নীতিবান, সুস্থ- সবল দৈহিক কাঠামো অধিকারী ছিলেন॥সামাজিক ভাবে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধমীয় প্রতিষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সেক্রেটারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দীন আর নেই, সকল স্তরের ছড়িয়ে পড়লে যশোরের পরিচিত বন্ধু মহল থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধা সহকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেনীর পেশাজীবী মানুষ দেখতে আসেন। ৭১ এর এই বীর মুক্তিযোদ্ধা গত (১৫-১২-২০১৬) রাত ১১ টার দিকে খুলনার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ।পরদিন জুম্মাবাদ মরহুমের নিজ গ্রামে সলুয়া  হাফেজীয়া মাদ্রাসাস্থ  মাঠে জানাযা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে সলুয়ার কারিকর পাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নাজিম উদ্দিনের শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড.মনিরুল ইসলাম মনির। তাঁর মৃত্যুতে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এসময় স্থানীয় প্রাক্তন চেয়ারম্যান-মরহুমের বড় ভাই মোঃ মোকাররম হোসেন, চৌগাছা উপজেলা আওয়ামীলীগৈর সাবেক সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা শাহাজান কবির, সহ স্থানীয় সাধারণ জনগন উপস্থিত ছিলেন। শোকাহত সলুয়া । বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নাজিম উদ্দীনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
Previous
Next Post »